কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারের আসক্তি

কম্পিউটার ও ইন্টারনেট আসক্তি (Internet Addiction Disorder) হলো অত্যধিক ও অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন কার্যকলাপ, যা দৈনন্দিন জীবন, কর্মক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে পিঠে ব্যথা, চোখের সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে। আসক্তি কাটাতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ এবং শারীরিক চর্চা প্রয়োজন।  আসক্তি বলে একটি ভীতিকর শব্দ আছে এবং সবাই নিশ্চয়ই এর সাথে পরিচিত। সাধারণত আসক্তি শব্দটি ব্যবহৃত হয় মাদকের সাথে। কোনো একজন ব্যক্তি মাদকে আসক্ত হয়ে গেলে তার জীবনটা ক্রমশ নষ্ট হয়ে যায় এবং নেশা থেকে বের হয়ে আসা কত কঠিন আমরা সবাই সেটা জানি।
 
কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারের আসক্তি

কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে কম্পিউটার এবং কম্পিউটার ব্যবহারের মতো এমন চমৎকার একটি বিষয়ের সাথে আসক্তির মতো ভয়ংকর একটি নেতিবাচক শব্দ কেমন করে জুড়ে দেওয়া হলো সেটি নিয়ে তোমাদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই অবাক হয়েছ। তোমাদের ভেতর যাদের কম্পিউটার আছে, তাদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই ইন্টারনেট বা কম্পিউটার গেম খেলতে খেলতে সময় পার করছ। খেলাধুলা করে যেমন শরীর ভালো থাকে, তেমনি কিছু সময় কম্পিউটার গেম খেললেও ক্ষতি নেই, বরং অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পায়।
 
কম্পিউটার ও ইন্টারনেট আসক্তি বর্তমানে একটি গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য উদ্বেগে পরিণত হয়েছে, যা দৈনন্দিন জীবন, পড়াশোনা এবং শারীরিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয় যখন কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকে। তখন পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়, পরিবারের সাথে সময় কাটানো কমে যায়। বন্ধু-বান্ধব, বাবা-মাকেও কম সময় দেওয়া হয়।
 
যদি কেউ কম্পিউটার গেম কিংবা ফেসবুকের মতো কোনো একটি সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি সময় ব্যয় করে, এতে স্বাভাবিক জীবনের ক্ষতিসাধন হতে শুরু করে। এই কারণেই বিজ্ঞানীরা এমন কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট নামে বিস্ময়কর সম্পদের সাথে আসক্তি নামক নেতিবাচক শব্দটি যুক্ত করার কারণ বুঝতে পেরেছেন।
 
আসক্তি বলতে বোঝানো হয় যখন কেউ কোনো কাজটি করা ঠিক হচ্ছে না জানলেও সেই কাজটি না করে থাকতে পারে না। মানুষের মধ্যে এটি যেমন হতে পারে, ঠিক সেরকম কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের ক্ষেত্রেও এটি হতে পারে। মাদক যেমন জীবনের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি মাত্রাতিরিক্ত কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহারও ক্ষতির কারণ হতে পারে।

কম্পিউটার আসক্তির বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই করবেন?


কাউন্সেলিং, টিপস এবং সহায়তার জন্য একজন কাউন্সেলরের সাথে দেখা করুন অথবা একটি সহায়তা গোষ্ঠীতে যোগদানের কথা বিবেচনা করুন।

তথ্য এবং চিকিৎসার জন্য একজন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে পরামর্শ করুন।

আপনার ইন্টারনেট অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করুন এবং সীমিত করুন। আপনার ইন্টারনেট ব্যবহারের একটি লগ রাখুন। 
অন্যান্য আগ্রহ তৈরি করুন। ক্যাম্পাস ক্লাব এবং সংস্থাগুলিতে জড়িত হন। ...
নিজের যত্ন নিন।

  কম্পিউটার গেম আসক্তি

 
কম্পিউটার গেম আসক্তিটা প্রায় সময়ই শুরু হয় শৈশব থেকে এবং বেশিরভাগ সময় ঘটে অভিভাবকদের অজান্তে। কম্পিউটার একটি টুল এবং এটি দিয়ে নানা ধরনের কাজ করা যেতে পারে। এই প্রযুক্তি সম্পর্কে এত সুন্দর সুন্দর কথা বলা হয়েছে যে অনেক সময় অভিভাবকরা ধরে নেন এটা দিয়ে যা কিছু করা হয় সেটাই বুঝি ভালো।
 
কিন্তু যখন তারা দেখেন তাদের সন্তানরা দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে বসে আছে, তারা বুঝতে পারেন না তার মাঝে সতর্ক হওয়ার ব্যাপার রয়েছে। কম্পিউটার গেম এক ধরনের বিনোদন এবং এই বিনোদনের নানা রকম মাত্রা রয়েছে। যারা এটি খেলছে তারা এটাকে নিছক বিনোদন হিসেবে নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার করলে সেটি একসময় ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
 
বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে এটি খুবই মারাত্মক। দেখা গেছে একটি ছোট শিশু থেকে শুরু করে পূর্ণ বয়স্ক মানুষ পর্যন্ত সবাই কম্পিউটার গেমে আসক্ত হয়ে যেতে পারে। কোরিয়ার একজন মানুষ টানা দীর্ঘ সময় কম্পিউটার গেম খেলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল— চীনে এক দম্পতি কম্পিউটার গেম খেলার কারণে তাদের শিশুসন্তানকে ক্ষুধায় রেখে দিয়েছিল। এই উদাহরণগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় কম্পিউটার গেমে আসক্ত হয়ে যাওয়া মোটেও বিচ্ছিন্ন কিছু নয় এবং একটু সতর্ক না থাকলে একজন খুব সহজেই আসক্ত হয়ে যেতে পা
কম্পিউটার কিংবা কম্পিউটার গেমে আসক্তির বিষয়টা যেহেতু নতুন, তাই সেগুলো নিয়ে গবেষণা এখনো খুব বেশি হয়নি। কিন্তু ভবিষ্যতে পুরো বিষয়টি নিয়ে গবেষকরা আরো নিশ্চিতভাবে দিক-নির্দেশনা দিতে পারবেন। এখনই গবেষণায় দেখা গেছে কোনো একটা কম্পিউটার গেমে তীব্রভাবে আসক্ত একজন মানুষের মস্তিষ্কে বিশেষ উত্তেজক রাসায়নিক দ্রব্যের আবির্ভাব হয়। শুধু তাই নয় যারা সপ্তাহে অন্তত ছয় দিন টানা দশ ঘণ্টা করে কম্পিউটার ব্যবহার করে তাদের মস্তিষ্কের গঠনেও এক ধরনের পরিবর্তন হয়ে যায়।

কাজেই কম্পিউটার গেম চমৎকার একটা বিনোদন হতে পারে- কিন্তু এতে আসক্ত হওয়া খুব সহজ এবং তার পরিণতি মোটেও ভালো নয়, সেটা সবাইকে মনে রাখতে হবে।

সামাজিক নেটওয়ার্কে আসক্তি


মানুষ সামাজিক প্রাণী এবং মানুষের নিজেদের ভেতর সবসময়েই একধরনের সামাজিক যোগাযোগ ছিল- কিন্তু ইদানীং সামাজিক যোগাযোগের কথা বলা হলে সেটি মানব সভ্যতার সেই চিরন্তন সামাজিক যোগাযোগ বা সামাজিক নেটওয়ার্কের কথা না বুঝিয়ে ইন্টারনেট-নির্ভর সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধরনের নেটওয়ার্কের কথা বোঝানো হয়। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, গুগলপ্লাস- এ ধরনের অনেক সামাজিক যোগাযোগ সাইট রয়েছে যেগুলোতে মানুষ নিজেদের পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারে। এক সময় এই সাইটগুলো ছিল কম বয়সী তরুণ-তরুণীদের জন্যে, এখন সব বয়সী মানুষই সেটি ব্যবহার করে। শুধু যে একে অন্যের সাথে যোগাযোগের জন্যে এটি ব্যবহার করে তা নয়, একটা বিশেষ আদর্শ বা মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যেও এটি ব্যবহার করা হয়। যে উদ্দেশ্যে এটি শুরু হয়েছিল যদি এটি সেই উদ্দেশ্যের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকত তাহলে এটি কোনো সমস্যার জন্ম দিত না, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি সামাজিক যোগাযোগ সাইটে আসক্তি ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীর জন্যেই একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়ে যেতে শুরু করছে।

মনোবিজ্ঞানীরা এটা নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন এবং এখন এটি মোটামুটিভাবে নিশ্চিত বলা যায় এই সাইটগুলোর সাফল্য নির্ভর করে, সেগুলো কত দক্ষতার সাথে ব্যবহারকারীদের আসক্ত করতে পারে। পুরো কর্মপদ্ধতির মাঝেই যে বিষয়টি রয়েছে সেটি হচ্ছে কত বেশিবার এবং কত বেশি সময় একজনকে এই সাইটগুলোতে টেনে আনা যায় এবং তাদেরকে দিয়ে কোনো একটা কিছু করানো যায়। যে যত বেশিবার এই সাইট ব্যবহার করবে সেই সাইটটি তত বেশি সফল হিসেবে বিবেচিত হবে এবং অবশ্যই সেটি তত বেশি টাকা উপার্জন করবে। কাজেই কেউ যদি অত্যন্ত সতর্ক না থাকে তাহলে তার এই সাইটগুলোতে পুরোপুরি আসক্ত হয়ে যাবার খুব বড় একটা আশঙ্কা রয়েছে।

মনোবিজ্ঞানীরা এই সাইটগুলো বিশ্লেষণ করে আরো একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় আবিষ্কার করেছেন। সব মানুষের ভেতরেই নিজেকে প্রকাশ করার একটা ব্যাপার রয়েছে কিংবা নিজেকে নিয়ে মুগ্ধ থাকার এক ধরনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা থাকে, সেটাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় Narcissism বলে- সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে মানুষের এই সুপ্ত বাসনাকে জাগ্রত করে দেয়। সবার ভেতরই তখন নিজেকে জনপ্রিয় করে তোলার এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। জেনে হোক না জেনে হোক ব্যবহারকারীরা নিজের সম্পর্কে অত্যন্ত তুচ্ছ খুঁটিনাটি তথ্য সবার সামনে উপস্থাপন করতে থাকে, কেউ সেটি দেখলে সে খুশি হয়, কেউ পছন্দ করলে আরো বেশি খুশি হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকটা মাদকের মতো কাজ করে এবং একজন ব্যবহারকারী ঘণ্টার পর ঘন্টা এই যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের সময় অপচয় করতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগের এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কারণে সারা পৃথিবীতে অনেক সময়ের অপচয় হচ্ছে।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url