একুশ শতকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি
একুশ শতকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি হলো জ্ঞান ও তথ্যের যুগ, যেখানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, যা শিক্ষা, অর্থনীতি, যোগাযোগ এবং সামাজিক উন্নয়নে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে; এর মাধ্যমে শিক্ষাকে কেন্দ্র থেকে শিক্ষার্থীদের দিকে আনা, বিশ্বব্যাপী সংযোগ স্থাপন, এবং সমস্যা সমাধানের নতুন উপায় তৈরি হয়েছে, যা একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা যেমন - সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা ও সহযোগিতা বিকাশে সহায়তা করছে। বিগত শতাব্দীতে সম্পদের যে ধারণা ছিল, একুশ শতকে এসে সেটি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। পৃথিবীর সবাই মেনে নিয়েছে যে, একুশ শতকের সম্পদ হচ্ছে জ্ঞান। যার অর্থ কৃষি, খনিজ সম্পদ কিংবা শক্তির উৎস নয়, শিল্প কিংবা বাণিজ্যও নয়— এখন পৃথিবীর সম্পদ হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তার কারণ শুধু মানুষই জ্ঞান অন্বেষণ করতে পারে, জ্ঞান ধারণ করতে পারে এবং জ্ঞান ব্যবহার করতে পারে। পৃথিবীর সম্পদের এই নতুন ধারণাটি সারা পৃথিবীতেই মানুষের চিন্তাভাবনার জগতটি পাল্টে দিয়েছে। পৃথিবীর মানুষ এখন একুশ শতকের মুখোমুখি হওয়ার জন্যে আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।
একাদশ শ্রেণির তথ্য প্রযুক্তি বলতে কি বুঝায়?
তথ্য প্রযুক্তি (ICT) হল কম্পিউটারের ব্যবহার যা ডেটা বা তথ্য সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার, প্রেরণ এবং পরিচালনা করে । ব্যক্তিগত বা বিনোদন প্রযুক্তির বিপরীতে, ICT সাধারণত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়। আইটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) একটি উপসেট হিসাবে বিবেচিত হয়।
একুশ শতকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি
আমরা সবাই অনুভব করতে পারছি একুশ শতকের পৃথিবীটা আসলে জ্ঞানভিত্তিক একটা অর্থনীতির ওপর দাঁড়াতে শুরু করছে। একুশ শতকে এসে আমরা আরো দুটি বিষয় শুরু করেছি— যার একটি হচ্ছে Globalization, অন্যটি হচ্ছে Internationalization। এই দুটি বিষয় ত্বরান্বিত হওয়ার পেছনের কারণটি হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। যেকোনো দেশের ভৌগোলিক সীমানা বিশ্বায়নের কারণে নিজের দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যাপারটি বোঝার জন্যে আমরা আমাদের বাংলাদেশের উদাহরণটিই নিতে পারি । আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে— তারা যে যেখানে আছে সেই অংশটুকুই বাংলাদেশ । এক অর্থে বাংলাদেশের সীমানা ছড়িয়ে গেছে! আবার বাংলাদেশের অধিবাসী হয়েও তারা পৃথিবীর অন্য দেশের নাগরিক হয়ে বেঁচে আছে, আন্তর্জাতিকতা এখন এই নতুন পৃথিবীর অলিখিত নিয়ম ।
একবিংশ শতাব্দীতে আইসিটির গুরুত্ব:
ডিজিটাল সংযোগ: সারা বিশ্বকে একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত করেছে।
শিক্ষা ও গবেষণা: অনলাইন লার্নিং এবং ই-বুকের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন সহজ হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: ই-কমার্স এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
দ্রুত সেবা: ই-গভর্নেন্সের মাধ্যমে নাগরিক সেবা এখন হাতের মুঠোয়।
একবিংশ শতাব্দী এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (ICT) সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এই যুগে আইসিটি মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, ব্যবসা এবং সরকারি সেবাকে আমূল পরিবর্তন করেছে। আমরা জানি, পৃথিবীর মানুষকে এক সময় বেঁচে থাকার জন্যে পুরোপুরি প্রকৃতির অনুকম্পার ওপর নির্ভর করতে হতো। মানুষ বিভিন্ন যন্ত্র আবিষ্কার করে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এনেছে। অষ্টাদশ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লবের পর মানুষ যন্ত্রের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীর অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। পৃথিবীর যে সকল জাতি শিল্প বিপ্লবে অংশ নিয়েছিল, এক সময় তারাই পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। একুশ শতকে যখন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির সূচনা হয়েছে, তখন আবার সেই একই ব্যাপার ঘটছে। যারা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তৈরি করার বিপ্লবে অংশ নেবে তারাই পৃথিবীর চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করবে।
একবিংশ শতাব্দীর যোগাযোগ প্রযুক্তি কি?
একবিংশ শতাব্দীর যোগাযোগ প্রযুক্তি একবিংশ শতাব্দীর যোগাযোগ ICT মধ্যে রয়েছে সমসাময়িক সরঞ্জাম, ডিভাইস এবং স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, ইমেল এবং ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মতো প্ল্যাটফর্ম । এই প্রযুক্তিগুলি ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিকভাবে এবং বিশ্বজুড়ে তথ্য ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
একুশ শতকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি। তবে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা একটি সমৃদ্ধ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি। এই নতুন বিপ্লবে অংশ নিতে হলে বিশেষ এক ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে সেটি আমরা অনুভব করতে পারি। যদি আমরা বেঁচে থাকার সুনির্দিষ্ট দক্ষতাগুলো দেখতে চাই তাহলে সেগুলো হবে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব, যোগাযোগ দক্ষতা, সুনাগরিকত্ব, সমস্যা সমাধানে পারদর্শী, বিশ্লেষণী চিন্তন দক্ষতা (Critical Thinking), সৃজনশীলতা এবং তার সাথে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে পারদর্শিতা।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ও আমাদের বাংলাদেশ
একুশ শতকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) মানবসভ্যতার প্রতিটি স্তরে আমূল পরিবর্তন এনেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে পারদর্শিতা সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা (Skill) হিসেবে খুব দ্রুত স্থান করে নিচ্ছে। একুশ শতকে টিকে থাকতে হলে সবাইকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রাথমিক বিষয়গুলো জানতে হবে। এই প্রাথমিক বিষয়গুলো জানা থাকলেই একজন এটি ব্যবহার করে তার বিশাল বৈচিত্র্যের জগতে প্রবেশ করতে পারে। একজন শিক্ষার্থী যতক্ষণ পর্যন্ত এই প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত না হবে— ততক্ষণ পর্যন্ত সে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, সংযোজন, মূল্যায়ন করে নতুন তথ্য সৃষ্টি করতে পারবে না ৷ এই দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে সে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে জ্ঞানভিত্তিক সমাজে স্থান করে নিতে পারবে না।
