ই সার্ভিস ও বাংলাদেশ ই কমার্স ও বাংলাদেশে
বাংলাদেশে ই-সার্ভিস ও ই-কমার্স ডিজিটাল উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ই-সার্ভিসের মাধ্যমে জন্ম নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট আবেদন, অনলাইন বিল পরিশোধ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সহজ হয়েছে। এতে সময়, খরচ কমছে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়ছে।
অন্যদিকে ই-কমার্স বাংলাদেশের ব্যবসা ও অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত খুলেছে। দারাজ, চালডাল, আজকেরডিলসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানুষ ঘরে বসেই পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করতে পারছে। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে এবং দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হচ্ছে। বাংলাদেশে ই-সার্ভিস ও ই-কমার্স বর্তমান সময়ে ডিজিটাল বিপ্লবের দুটি প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে এই দুই খাতের বিস্তারিত করা হলো:
- ই সার্ভিস ও বাংলাদেশ
- ই কমার্স ও বাংলাদেশ
ই সার্ভিস ও বাংলাদেশ
বাংলাদেশে ই- সার্ভিস ও ই-কমার্স ডিজিটাল বিপ্লবের অংশ, যেখানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা কেনাবেচা (ই-কমার্স) এবং সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণ (ই-সার্ভিস) জনপ্রিয়তা পাচ্ছে; 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' ঘোষণার পর থেকে এর প্রসার ঘটেছে, যেখানে দারাজের মতো বড় প্ল্যাটফর্ম এবং ফেসবুকভিত্তিক অসংখ্য ছোট-বড় উদ্যোক্তা (এসএমই) তৈরি হয়েছে, যা মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস (MFS) যেমন বিকাশ, নগদ ইত্যাদির মাধ্যমে লেনদেন সহজ করেছে এবং দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে অথবা
সময়ে সময়ে দেশের জনগণকে বিভিন্ন সেবা প্রদান করে থাকে। এই সেবা হতে
পারে এক স্থান থেকে
অন্য স্থানে যাতায়াত কিংবা কোনো জমির দলিলের নকল সরবরাহ করা। ডিজিটাল পদ্ধতি চালু হওয়ার পূর্বে এই সকল সেবার
ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাকে অবশ্যই সেবাদাতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে হতো। কিন্তু ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেবাগ্রহীতা নিজ বাড়িতে বসেই মোবাইল ফোনে বা ইন্টারনেটে একই
সেবা গ্রহণ করতে পারে। উদাহরণ হিসাবে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাওয়ার জন্য কোনো আন্তঃনগর ট্রেনের টিকেট সংগ্রহের কথা বিবেচনা করা যায় । কিছুদিন পূর্বেও
এই টিকেট সংগ্রহের জন্য যাত্রী নিজে অথবা তার কোনো লোকের ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে, লাইনে দাঁড়িয়ে নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে টিকেট সংগ্রহ করতে হতো। এই পদ্ধতি এখনও
বহাল আছে। তবে, এর পাশাপাশি এখন
যে কেউ অনলাইনে টিকেট সংগ্রহ করতে পারে। অনলাইনেই টিকেটের মূল্য পরিশোধ করা যায়। এভাবে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সেবা প্রদানের ব্যাপারটি ই-সার্ভিস বা
ই-সেবা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ই-সেবার প্রধান
প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এটি স্বল্প খরচে, স্বল্প সময়ে এবং হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরসমূহের উদ্যোগে
ইতোমধ্যেই অনেক ই-সেবা চালু
হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য
হলো পাঠ্যপুস্তকের ডিজিটাল সংস্করণ, ই-পূর্জি, ই-পর্চা, ই-টিকেট, টেলিমেডিসিন,
অনলাইন আয়কর হিসাব করার ক্যালকুলেটর ইত্যাদি। নিম্নে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ই-সেবা কার্যক্রমের
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো।
ক. ই-পূর্জি
: দেশের প্রথম দিককার ই-সেবাসমূহের একটি।
দেশের ১৫টি চিনিকলের সকল আখচাষি এখন এসএমএসের মাধ্যমে পূর্জি তথ্য পাচ্ছে । পূর্জি হচ্ছে
চিনিকলসমূহে কখন আখ সরবরাহ করতে
হবে সে জন্য আওতাধীন
আখচাষিদের দেওয়া একটি অনুমতিপত্র। এসএমএসের মাধ্যমে আখচাষিরা তাৎক্ষণিকভাবে পূর্জির তথ্য পাচ্ছে বলে এখন তাদের হয়রানি ও বিড়ম্বনার অবসান
হয়েছে। পাশাপাশি সময়মতো আখের সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় চিনিকলের উৎপাদনও বেড়েছে।
খ. ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সিস্টেম (ই-এমটিএস) : বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সিস্টেমের মাধ্যমে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে নিরাপদে, দ্রুত ও কম খরচে টাকা পাঠানো যায় ৷ ১ মিনিটের মধ্যে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাঠানো যায়। দেশের প্রায় সকল ডাকঘরে এই সেবা পাওয়া যায় ৷
গ. ই-পর্চা সেবা : বর্তমানে দেশের সকল জমির রেকর্ডের অনুলিপি অনলাইনে সংগ্রহ করা যায় । এটিকে বলা হয় ই-পর্চা। পূর্বে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মীগণ বড় বড় রেকর্ড বই থেকে তথ্যসমূহ পূর্ব নির্ধারিত ছকে পূরণ করে আবেদনকারীকে সরবরাহ করতেন। এজন্য আবেদনকারীকে যেমন সরাসরি উপস্থিত হতে হতো তেমনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মীরাও গতানুগতিক পদ্ধতিতে পর্চা তৈরি করতেন। বর্তমানে এটি ই-সেবার আওতায় আসাতে আবেদনকারী দেশ-বিদেশের যেকোনো স্থান থেকেই নির্দিষ্ট ফি জমা দিয়ে পর্চা সংগ্রহ করতে পারেন।
ঘ. ই-স্বাস্থ্যসেবা : বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসকরা এখন মোবাইল ফোনে স্বাস্থ্য পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এজন্য দেশের সকল সরকারি হাসপাতালে একটি করে মোবাইল ফোন দেওয়া হয়েছে। দেশের যেকোনো নাগরিক এভাবে যেকোনো চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে পারেন। এছাড়া দেশের কয়েকটি হাসপাতালে টেলিমেডিসিন সেবা চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে রোগী হাসপাতালে না এসেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা ও পরামর্শ পাচ্ছেন ।
ই-কমার্স ও বাংলাদেশ
একটি দেশের বিকাশ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাণিজ্যের কোনো বিকল্প নেই। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশ, ইন্টারনেটের উদ্ভব ও বিকাশ এবং কাগজের মুদ্রার বাইরেও ইলেকট্রনিক বিনিময় প্রথা চালু হওয়ার ফলে বাণিজ্যেরও একটি বিশেষ পরিবর্তন হয়েছে। এখন ইলেকট্রনিক মাধ্যমেও বাণিজ্য করা যায়, যার প্রচলিত নাম ই-কমার্স বা ই-বাণিজ্য ।যেকোনো পণ্য বা সেবা বাণিজ্যের কয়েকটি শর্ত থাকে। প্রথমত বিক্রেতার কাছে পণ্য থাকা। দ্বিতীয়ত ক্রেতা কর্তৃক তার বিনিময় মূল্য পরিশোধ করা। এর প্রধান পদ্ধতি হলো বিক্রেতার সঙ্গে ক্রেতার সরাসরি যোগাযোগ। কিন্তু ইন্টারনেটের যুগে একজন বিক্রেতা তার পণ্যের ছবি, ভিডিও দিয়ে ইন্টারনেটেই তার ‘দোকান’টি খুলে বসতে পারেন। এজন্য তার প্রতিষ্ঠানের একটি ওয়েবসাইট চালু করতে হয়। ক্রেতা অনলাইনে তার পছন্দের পণ্যটি পছন্দ করেন এবং মূল্য পরিশোধ করেন। দেশে বর্তমানে বিভিন্ন ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে এই মূল্য পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও মূল্য পরিশোধ করা যায়। তৃতীয়ত মূল্য প্রাপ্তির পর বিক্রেতা তার পণ্যটি ক্রেতার ঠিকানায় নিজে অথবা পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের (কুরিয়ার সার্ভিস) মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন ৷
মোবাইল বা কার্ড ছাড়াও ই-কমার্সে আরো একটি বিল পরিশোধ পদ্ধতি রয়েছে। এটিকে বলা হয় প্রাপ্তির পর পরিশোধ বা ক্যাশ অন ডেলিভারি (COD)। এই পদ্ধতিতে ক্রেতা বিক্রেতার ওয়েবসাইটে বসে পছন্দের পণ্যটির অর্ডার দেন। বিক্রেতা তখন পণ্যটি ক্রেতার কাছে পাঠিয়ে দেন। ক্রেতা পণ্য পেয়ে বিল পরিশোধ করেন।
বাংলাদেশে ই-সার্ভিস ও ই-কমার্স তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ই-সার্ভিসের মাধ্যমে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট আবেদন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল পরিশোধ, ভূমি সেবা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা যায়। এতে সময় ও খরচ কমে এবং সেবার মান উন্নত হয়। অন্যদিকে ই-কমার্সের মাধ্যমে অনলাইনে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় সহজ হয়েছে। দারাজ, চালডাল, ফুডপান্ডা, রকমারি ইত্যাদি প্ল্যাটফর্ম জনপ্রিয়। ই-কমার্স ব্যবসা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
২০১১-১২ সাল থেকে বাংলাদেশেও আস্তে আস্তে ই-কমার্সের প্রসার হচ্ছে। বর্তমানে বই থেকে শুরু করে জামা, কাপড়, খাবার, শৌখিনসামগ্রী ইত্যাদি ই-কমার্সের মাধ্যমে বেচাকেনা হচ্ছে। প্রচলিত বাণিজ্যের মতো ই-কমার্সেও দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান লক্ষ করা যায়। এক ধরনের প্রতিষ্ঠান কেবল নিজেদের পণ্য বিক্রয় করে থাকে। আবার কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রয় করে। তোমরা ইতোমধ্যে ওয়েবসাইট, টিভি বা পত্র-পত্রিকায় এধরনের অনেক ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন দেখে ফেলেছ ।
ঙ.
রেলওয়ের ই-টিকেটিং ও
মোবাইল টিকেটিং : বাংলাদেশ রেলওয়ের কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেনের টিকেট এখন মোবাইল ফোনেও ক্রয় করা যায়। আবার অনলাইনেও টিকেট সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে, নিজের সুবিধামতো সময়ে রেলস্টেশনে না গিয়েও নির্দিষ্ট
গন্তব্যের টিকেট সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে। মোবাইল ফোন বা অনলাইনে টিকেট
সংগ্রহ করা হলে ট্রেন ছাড়ার অল্প সময় পূর্বে যাত্রীকে স্টেশনে যেতে হয় এবং মোবাইল ফোন বা অনলাইনে প্রাপ্ত
গোপন নম্বর প্রদর্শন করে সেখানে নির্ধারিত কাউন্টার থেকে যাত্রার টিকেট সংগ্রহ করে নিতে হয়।
